কার্ল মার্ক্সের স্ট্যাচু

কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কসপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা হয়েছে গতকাল। উদ্দেশ্য ছিলো শিক্ষার্থীদের সাথে মার্কসকে পরিচয় করিয়ে দেয়া। জানার কৌতুহল থেকে আমিও গেলাম। আমিই একমাত্র অমার্কসবাদী শ্রোতা ছিলাম কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত নই।

গিয়ে মনে হলো, চট্টগ্রামের আল্লামা তাহেরশাহ ভক্ত সুন্নীদের মজলিশে বোধহয় ঢুকে পড়েছি ভুল করে। ভক্তির ঠেলায় টেকা যাচ্ছে না। হার্ডকোর ‘বস্তুবাদী’দের মার্কসবন্দনার চোটপাটে আমি দিশেহারা।

প্রায় প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন, মার্কস সম্বন্ধে তাদের পড়াশোনা নাই। নিতান্তই একাডেমিক প্রয়োজনে ২/৪ পাতা পড়েছেন। এর বেশি কিছু নয়। তবে এটুকু বলার পরই শুরু হয় মার্কস বন্দনা। পুরাই ‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা, সব ভুলিব, কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না’ অবস্থা।

লন্ডন ফেরত এক মার্কসবাদী বক্তব্য দিলেন। বক্তব্যের আগে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, তিনি মার্কসের মাজার লন্ডনিস্থানে ১০ বছর থেকে এসেছেন। বক্তা নিজেও দাবি করলেন, লন্ডনের সাথে তার ‘আবেগগত’ সম্পর্ক আছে। মার্কসের মাজারের পাশে বেঞ্চিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থেকে তিনি মার্কসকে অনুভব করার চেষ্টা করতেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরাই আধ্যাত্মিক ব্যাপার-স্যাপার।

আরেকজন এসে শুরু করলেন সাবঅল্টার্ন দিয়ে। মাঝখানে এক চিমটি রবীন্দ্রনাথ ও লালন। তারপর মুঘল আমলের ‘আশরাফ-আতরাফের’ ঘুটা। ব্যস! হয়ে গেলো “ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন” প্রশ্নটা। কমপ্লিট প্যাকেজ অব মার্কসবাদ!

কিন্তু সবকিছু যদি ‘উৎপাদন সম্পর্কের’ ব্যাপার হয়, সবই যদি বস্তুগত ব্যাপার হয়, তাহলে এইসব মার্কসবাদীদের এত গদগদ আবেগ কোত্থেকে আসে? ‘ব্যক্তিমালিকানার ধারণা’ যদি নিছক পুঁজিবাদ আরোপিত ব্যাপারই হয়, তাইলে আমার দেড় বছরের পিচ্চি ভাতিজার মধ্যেও সেই ধারণার অনুপ্রবেশ ক্যামনে ঘটলো? পুঁজিবাদ কি ইদানীং মায়ের পেট থেকেই ব্রেইনওয়াশ শুরু করসে নাকি? মার্কস বলেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাস হলো দ্বান্দ্বিকতার ইতিহাস। হেগেলের সূত্র ধরে তিনি যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রস্তাব করেছেন, সেটা কি তাঁর প্রস্তাবিত কমিউনিজমেও কাজ করবে? না করার তো কথা না। আর করলে তো তাঁর সূত্র অনুসারেই কমিউনিজম টিকবে না। ভেঙ্গে নতুন কিছু হবে।

এইসব সাধারণ প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কসবাদী একাডেমিকসদের সেই প্রোগ্রামে ছিলো না। ভেবেছিলাম প্রশ্নোত্তর পর্বে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই তারা বলে দিয়েছেন, চাইলে কেউ প্রশ্ন করতে পারে। তবে উত্তর দেয়ার কেউ নাই।

কারণ, তারা তো আগেই বলে দিয়েছেন, তারা মার্কস পড়েননি। তারা তো নিছক ভক্ত মাত্র!

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *