
১.
ছোটবেলা থেকে “ইসলামী রাষ্ট্র” বলতে বুঝে এসেছি— চোরের হাত কাটা, ব্যাভিচারীকে পাথর মারা, সুদ নিষিদ্ধ হওয়া, আর অতি অবশ্যই নামাজ কায়েম করা (অর্থাৎ নামাজের সময় সবাইকে মসজিদে যেতে বাধ্য করা)।
আমার এই ভুল ধারণাটা মূলত ভেঙেছে ২০১১ সালের দিকে মোজাম্মেল স্যারের এই লেখাটা পড়ে— ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা।
তারপর ধীরে ধীরে তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং আরো ক্লিয়ার হয়েছে। ইসলামকে নিছক একটি ধর্ম বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে আরো বৃহত্তর অর্থে বুঝতে শিখেছি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসলাম হলো জীবন চলার গাইডলাইন, আর বৃহত্তর অর্থে এটি একটি সভ্যতাগত ব্যাপার— ইসলামকে এখন এভাবে বিবেচনা করি।
সমস্যা হলো, ট্র্যাডিশনাল মুসলমান ও আলেমরা ইসলামকে দেখেন একটা নিছক ধর্ম হিসেবে। আর সংস্কারপন্থী তথা রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা ইসলামকে দেখেন একটি ধর্ম + রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে।
ইসলামের মতো বৃহত্তর একটি কনসেপ্টকে এই সংকীর্ণ অর্থে সীমাবদ্ধ করে ফেলায় এর মূল আপিলটা মানুষের কাছে ফুটে ওঠছে না। ফলে উভয় দলই ইসলামকে চাপিয়ে দিতে চান।
২.
আমার একটা অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ বলি। ইসলামের মোস্ট ফান্ডামেন্টাল বা সেন্ট্রাল কনসেপ্ট তথা ’তাওহীদ’ নিয়ে প্রচলিত আলাপে দেখা যায়— ফিকাহর বইগুলোতে তাওহীদ সংক্রান্ত আলোচনায় যেসব টার্ম ও জার্গন থাকে, সেইসবই পাবলিক লেকচারে কপচানো হয়। এর পাশাপাশি শিরক-বেদয়াত নিয়ে যেসব কথাবার্তা হয়। কিন্তু নবুওয়তের শুরুর বছরগুলোতে আল্লাহ তায়ালা যত সহজ ভাষায় মানুষকে তাওহীদ বুঝিয়েছেন, নানান যুক্তি দিয়েছেন, আমাদের ধর্মবেত্তাদেরকে সেগুলো বলতে দেখি না। তারা বরং যুক্তি-বুদ্ধিরই বিরোধী! অথচ কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাওহীদ বুঝাতে গিয়ে নানান উপমা ও যুক্তিই দিয়েছেন মূলত। সূরা ওয়াকিয়ার (৫৬) ৫৭-৭৪ নং আয়াত এর একটি উদাহরণ। কোরআনের ২৯-৩০ পারায় এ রকম অনেক উদাহরণ আছে।
তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে আমরা ইসলামের একটি সার্বজনীন বিশ্বপ্রকল্পের ধারণা পাই। কিন্তু এই বিশালত্বকে বুঝতে না পারার কারণে, নাকি সংকীর্ণ আত্মস্বার্থবাদী চিন্তার কারণে, লোকেরা কেন যেন পরকালের নাজাত লাভের চিন্তায় বিভোর থাকে। ফলে ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ অর্থাৎ দুনিয়ার যা হয় হোক, লোকজনকে ঠ্যাঙ্গিয়ে হলেও আমার বেহেশত নিশ্চিত করতে হবে— এমন একটা মানসিকতায় আচ্ছন্ন থাকে ধর্মবাদী এবং রাজনৈতিক ইসলামপন্থী মুসলমানরা।
তাওহীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং বুঝতে পারলে দুনিয়া সম্পর্কে একটা ইতিবাচক মনমানসিকতা থাকার কথা। ইসলামের বৃহত্তর আপিলকে ধরতে পারার কথা। কিন্তু, সেই ধৈর্য কই! যেভাবেই হোক, বেহেশত কনফার্ম করতে হবে— এই হলো ধারণা।
৩.
এক গার্মেন্টস কারখানায় সম্প্রতি নামাজ না পড়লে বেতন কাটার নোটিশ জারির পর মিডিয়াতে নিউজ হওয়ায় লোকেরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটি আমার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো। এই প্রতিক্রিয়া পরাজিত মানসিকতার মোক্ষম উদাহরণ। মানে পরাজিত হয়ে আছে, কিন্তু মানতে নারাজ যে সে পরাজিত— ছোটবেলায় খেলার মাঠের এ ধরনের স্মৃতি অনেকেরই আছে বোধকরি। ইসলামের সভ্যতাগত পতনের পর থেকে এটাই মুসলমানদের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৪.
গার্মেন্টসের ঘটনায় একজন তার পোস্টে সাজেস্ট করেছেন— বেতন না কেটে বরং নামাজ পড়ার জন্য ইনটেনসিভ দেয়া যেতো। সেখানে আমি নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছি:
আমার কাছে এমনকি ইনসেনটিভ দেয়াটাকেও সঠিক বলে মনে হয় না। বাচ্চাদেরকে অভ্যস্ত করানোর জন্য দেয়া যায় বটে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদেরকে নয়। প্রাপ্তবয়স্কদেরকে আল্লাহ তায়ালা আকল দিয়েছেন। এবং ইসলামের দাবি হলো এই আকলকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। একজন মুসলমান যে সত্যিই সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আমরা সেটার প্রত্যয়ন করে থাকি। তাই নামাজ আদায়ের জন্য ইনটেনসিভ দেয়ার মানে দাঁড়ায়— আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘুষ দিয়ে তাঁর প্রতি বান্দার সাবমিশন আদায় করা। যা প্রকারান্তরে আল্লাহর প্রতি অবমাননা। আল্লাহ কোনো বান্দার সাবমিশনের মুখাপেক্ষি নন— সূরা ইখলাসে বর্ণিত তাওহীদের এই মূল বিষয়টা বিবেচনায় রাখলে আমরা এটি সহজে বুঝতে পারি।
৫.
এবার মজার একটা ব্যাপার বলি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সুফিবাদকে প্রেফার করি না। কিন্তু এই ঘটনায় দেখলাম, সুফিবাদের প্রমোটর লোকজনও আইন করে লোকজনকে নামাজ পড়ানোর পক্ষে। এই তামাশা দেখার জন্য আসলেই প্রস্তুত ছিলাম না।