
২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় সূচিত ‘আরব বসন্তকে’ যদি বিপ্লব বলা হয়, তাহলে ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রতিবিপ্লব বলা যায়। সেক্যুলার স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের পর তিউনিসিয়ার নয়া পথ নির্মাণের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর বর্তেছিলো, এবারের নির্বাচনে জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখান করেছে। রাজনীতির বাইরে থেকে ওঠে আসা দুজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবার প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন। প্রথম হওয়া প্রার্থী কায়েস সাঈদ আইনের অধ্যাপক ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ। দ্বিতীয়জন নাবিল কারুয়ী একজন ব্যবসায়ী এবং মিডিয়া ম্যাগনেট।
গত কয়েকদিন তিউনিসিয়ার নির্বাচনী খবর পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এই পয়েন্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে–
এবার প্রথম রাউন্ডে নির্বাচিত দুই প্রার্থীর ব্যাপারে কিছু বলি।
কায়েস সাঈদ: আগেই বলেছি প্রথম হওয়া কায়েস সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ান এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ। ২০১১ সালের আগে তাঁকে তেমন কেউ চিনতো না। তখন থেকে টিভি প্রোগ্রামে সাংবিধানিক আইন বিষয়ে মতামত দিয়ে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়াটা ছিলো রীতিমতো চমক।
তিনি কোনো দল গঠন করেননি। তাঁর কোনো ডেডিকেটেড কর্মী বাহিনী নেই। লোকজন, বিশেষত তরুণরা স্বেচ্ছায় তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। তিনি নিজে কয়েকটি শহরে লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁর নির্বাচনী এজেন্ডাগুলো বুঝিয়েছেন।
তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পক্ষে। গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কাউকে অপসারণের অধিকার জনগণের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আদর্শিকভাবে তিনি ‘রক্ষণশীল’। সমকামিতার পক্ষে প্রচারণা, নারী-পুরুষের প্রকাশ্য যৌন আচরণ ইত্যাদির বিরোধী। উত্তরাধিকার সম্পত্তিসহ বিদ্যমান শরীয়াহ আইনগুলো বহাল রাখার পক্ষে তিনি।
নাবিল কারুয়ী: অন্যদিকে প্রথম রাউন্ডে দ্বিতীয় হওয়া নাবিল কারুয়ী কিছুদিন আগে একটি পার্টি গড়ে তোলেন। ধনকুবের এই প্রার্থী পপুলিস্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকটা বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের স্টাইলে তিনি দেশটির গরীব অঞ্চলগুলোতে মানুষদেরকে ফ্রি খাবার বিলিয়েছেন। এবং সেইসব তৎপরতা ফলাও করে তাঁর টিভি চ্যানেলে প্রচার করেছেন। লোকজন এতে আকৃষ্ট হয়েছে। এর বাইরে বিশেষ কোনো ভিশন তিনি দিতে পেরেছেন বলে চোখে পড়েনি।
নির্বাচনের কিছুদিন আগে শাহেদ সরকার তাঁকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গ্রেফতার করে। এখনো তিনি জেলে আছেন। এই গ্রেফতার তাঁর জন্য শাপেবর হয়েছে বলে মনে হয়।
তিউনিসিয়ার সাংবিধানিক আইন অনুসারে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়া প্রার্থীর মাঝে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। এ মাসেই সেটা হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে কায়েস সাঈদ নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, আননাহদার প্রার্থী দ্বিতীয় রাউন্ডে আসতে না পারায় তাদের ভোটগুলো ‘রক্ষণশীল’ সাঈদ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে, পপুলিস্ট নাবিলের পক্ষে একাট্টাভাবে সেক্যুলারদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। স্মর্তব্য, নাবিলকে গ্রেফতার করেছে ক্ষমতাসীন সেক্যুলার সরকার। তবে প্রথম দফায় ভোটপ্রদানে বিরত ভোটারদের অধিকাংশ দ্বিতীয় দফায় ভোট দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা বলা মুশকিল।
তিউনিসিয়ার নির্বাচন থেকে আমরা কী শিখলাম?